ঢাকা,  সোমবার   ০৫ অক্টোবর ২০২৬, ১৯ আশ্বিন ১৪৩৩

Advertisement
[ আন্তর্জাতিক ]

দুই টাকা পারিশ্রমিক পাওয়া কল্পনা এখন কোটিপতি!

আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশিত: ১৫:০৯, ১৭ মার্চ ২০২০
দুই টাকা পারিশ্রমিক পাওয়া কল্পনা এখন কোটিপতি!
ছবি: কল্পনা সরোজ

ভারতের মহারাষ্ট্রের এক দলিত পরিবারের মেয়ে কল্পনা সরোজ। ছোট থেকেই নানা সামাজিক এবং গার্হস্থ্য সহিংসতার মধ্যে বেড়ে উঠেছেন। কিন্তু অদম্য কর্মপ্রেরণা আর ইচ্ছাশক্তিতে ভর করে আজ তিনি প্রতিষ্ঠিত। দলিত পরিবার থেকে উঠে আসা সেই কল্পনা আজ ১১ কোটি ২০ লাখ ডলারের মালিক! 

শুধু তাই নয় ২০১৩ সালে পদ্মশ্রীতে সম্মানিত করা হয় তাকে। আর ২০০৬ সালে ‘রাজীব গান্ধী অ্যাওয়ার্ড ফর ওম্যান’ পান। তার গল্প এখন অনেক মেয়ের কাছেই অনুপ্রেরণা।

ছবি: কল্পনা সরোজ

Advertisement

মহারাষ্ট্রের ছোট্ট গ্রাম রোপারখেদায় জন্ম নেন কল্পনা সরোজ। আকোলা থেকে ৮ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত এই গ্রামের বেশিরভাগ পরিবারই দলিত। এসব পরিবারে শিক্ষা তো দূরের কথা, মেয়েদের কোনো স্বাধীনতাই ছিল না। বিয়েটা কী বিষয় তা বুঝতে শেখার আগেই শ্বশুরবাড়িতে পাঠিয়ে দেয়া হয় মেয়েদের।

কল্পনার বাবা ছিলেন পুলিশ কনস্টেবল। মেয়েকে অন্তত দশম শ্রেণি পাশ করাতে চেয়েছিলেন তিনি। কিন্তু সমাজের চাপে তা আর হয়ে ওঠেনি। স্কুলেও খুব অবহেলার শিকার হতে শুরু করেন তিনি। সহপাঠীরা কেউই তার সঙ্গে বসতে চাইতো না। খেতে বা খেলতেও চাইত না।

সপ্তম শ্রেণির ছাত্রী কল্পনাকে সমাজের চাপে বিয়ে দিতে বাধ্য হন কনস্টেবল বাবা। মুম্বাইয়ের একটা বস্তিতে স্বামী-শ্বশুর-শাশুড়ির সঙ্গে থাকতে শুরু করেন তিনি।

বিয়ের পর দিন থেকেই মানসিক এবং শারীরিক নির্যাতন শুরু হয় তার উপর। ছোট কল্পনাকে বাড়ির সব কাজ করতে হতো। একটু এদিক ওদিক হলেই চলত মারধর আর তার উপর সারাদিন না খাইয়ে রাখা হতো তাকে।

বিয়ের ছয়মাস পর মেয়েকে দেখতে শ্বশুরবাড়িতে ছুটে যান বাবা। প্রাণবন্ত মেয়েটার কঙ্কালসার চেহারা সহ্য করতে না পেরে, সেদিনই তাকে নিজের কাছে নিয়ে চলে আসেন তিনি। তারপর নিজের চেষ্টাতেই মেয়ের ডিভোর্সের ব্যবস্থা করেন। মেয়েকে নতুন করে স্কুলেও ভর্তি করিয়ে দেন।

সেখানেও বাধা ছিল সমাজ। চারদিক থেকে এত কুকথা শুনতে হত তাকে যে একদিন কল্পনা কীটনাশক খেয়ে আত্মহত্যার চেষ্টা করেন। তবে ভাগ্য তার জন্য অন্য কিছুই ঠিক করে রেখেছিল। তাই সে যাত্রায় শুধু বেঁচেই যাননি, বরং নতুন জন্ম পেয়েছিলেন তিনি।

এরপর মুম্বাইয়ে চাচার বাড়িতে থাকতে শুরু করেন কল্পনা। প্রথমে একটা কাপড়ের কারখানায় দুই টাকার চাকরি নেন। খুব তাড়াতাড়ি কাপড় সেলাই রপ্ত করে সিনিয়র টেইলর হয়ে যান। এর মাঝে তার বোনের কঠিন রোগ ধরা পড়ে। টাকার অভাবে বিনা চিকিৎসায় মারা যান তিনি। জীবনে টাকা কতোটা মূল্যবান তা উপলব্ধি করেন কল্পনা। 

তাই আরো বেশি উপার্জনের জন্য ঋণ নিয়ে সেলাই মেশিন কিনে নিজের ব্যবসা শুরু করেন তিনি। পরে স্টিল ব্যবসায়ী সমীর স্বরাজের সঙ্গে কল্পনার বিয়েও হয়। কিন্তু দ্বিতীয় স্বামী খুব কম বয়সেই মারা যান।

স্বামীর মৃত্যুর পর আড়াই লাখ টাকা দিয়ে একটা জমি কিনেছিলেন। জমিটার আইনি সমস্যা ছিল, তাই কম দামে পেয়ে গিয়েছিলেন। দু’বছর ধরে লড়াই করে সেই সমস্ত আইনি সমস্যা মেটানোর পরই জমির দাম ২৫ গুণ বেড়ে ৫০ লাখ টাকা হয়ে যায়। এখান থেকেই তার ভাগ্য পুরোপুরি বদলে যেতে শুরু করে।

তার দক্ষতা দেখে মহারাষ্ট্রের কোম্পানি কামানি টিউবস-এর কর্মী সমিতি তার দ্বারস্থ হয়। কামানি টিউবস ১৯৬০ সালে চালু হয়। কিন্তু কর্তৃপক্ষের সঙ্গে ওয়ার্কার্স ইউনিয়নের বিবাদের জেরে ১৯৮৫ সালে সেটা বন্ধ হয়ে যায়।

আর ২০০০ সালে কামানি টিউবস-এর কর্মী ইউনিয়ন তার কোম্পানির দায়িত্ব নেয়ার প্রস্তাব নিয়ে হাজির হন কল্পনার কাছে। প্রথমে খুব একটা ইচ্ছুক না থাকলেও কোম্পানির সাড়ে তিন হাজার কর্মীর করুণ অবস্থার কথা তিনি বেশ অনুভব করতে পারছিলেন।

কোম্পানিটা কিনে নেন কল্পনা। কিছু সময়ের মধ্যেই খুব সুন্দরভাবে চালু হয়ে যায় কামানি টিউবস। বেচাকেনায় লাভও করতে শুরু করে। এগুলো ছাড়াও আরও অনেক সামাজিক কাজকর্মে নিজেকে ব্যস্ত রাখতে শুরু করেন তিনি। কল্পনা সরোজ ফাউন্ডেশন প্রতিষ্ঠা করেন।

ডেইলি-বাংলাদেশ/জেএস
লিংক সফলভাবে কপি হয়েছে!